সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ।তাকে বিদেশে যেতে দিচ্ছে না সরকার।বিএনপি আন্দোলনের ডাক দিচ্ছে,এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক টোপ দিয়েছেন,নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপি থেকেও মন্ত্রী নেয়া হবে।বিএনপি এই টোপ গিলবে,নাকি চলমান আন্দোলন বেগবান করবে?অতীতের আন্দোলনের কিছু ইতিহাস স্মরণ করা যেতে পারে।রাষ্ট্রীয় জীবনের পরিবর্তনকারী ঘটনা এমনি ঘটে না।আপাতদৃষ্টিতে সামান্য উপলক্ষেও যদি বড় ঘটনা ঘটে যায় তাহলে বুঝতে হবে,গভীরে অবশ্যই কারণ আছে।একুশের ঘটনা ও আন্দোলন ইতোপূর্বের যেকোনো ঘটনার চেয়ে ব্যাপক ও গভীরতর ছিল।এ আন্দোলন পূর্ব বাংলার সমাজের সকল অংশ,কৃষক,শ্রমিক,মধ্যবিত্ত এবং উদীয়মান ধনিক শ্রেণীকে আলোড়িত করেছিল।এটি ছিল সকল শ্রেণীর মানুষের সব অভিযোগের প্রতীকী বিস্ফোরণ।ইতিহাসে এরকম দৃষ্টান্ত আরো আছে।যেখানে কোনো বিশেষ ঘটনা তার নিজস্ব শক্তির কারণে তত নয়,যত তার সঞ্চিত পটভূমির কারণে বিশিষ্ট বলে চিহ্নিত হয়েছে।
ফরাসি বিপ্লবের শুরুতে বাস্তিল দুর্গে জনতার সশস্ত্র আক্রমণ,রাশিয়ার ১৯০৫ সালের রক্তাক্ত রোববারের হত্যাকাণ্ড,চীনের ১৯১৯ সালের ৪ঠা মে,ভারতবর্ষে ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ,১৯৪৬ সালে নৌবিদ্রোহ এমনই কিছু দৃষ্টান্ত।
একটি আন্দোলনে প্রজ্ঞা ও শক্তির অধিকারী নেতার প্রয়োজন হয়,আবার অনেক সময় এরূপ ঘটনাই সে রকম শক্তির উৎস হয়ে ওঠে।সেরকম নেতৃত্বের সৃষ্টি করে এবং পরে তাকে লক্ষ্য করেই সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে।১৯০৫ এর বিপ্লবী আন্দোলন পর্যুদস্ত হওয়ার পর রাশিয়ার আন্দোলনরত সংগঠনগুলোর ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছিল।
যেকোনো আন্দোলনের পেছনে যে কারণ থাকে,জনসমাজের মধ্যে সেই কারণের গভীরতর উপলব্ধির মধ্যেই নিহিত থাকে আন্দোলনের সম্ভাবনা ও শক্তি।বাংলাদেশের অভ্যুদয় তেমনই এক বিপ্লবাত্মক ঘটনা।রক্তাক্ত সংগ্রামের জন্যই শুধু নয়।এ জন্যও নয় যে,এই ঘটনার পেছনে রয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মদান।এ ঘটনা বাংলাদেশের জনসাধারণের জন্য বিপ্লবের তাৎপর্য বহন করে এ জন্য যে,সেই ১৯৪৭ সাল থেকে তারা জীবন ও জীবিকার অধিকার আদায়ে যে প্রাণান্ত লড়াই করেছে,তারই পরিণামে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।রাষ্ট্রীয় জীবনে রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং রাষ্ট্রীয় দর্শনের কোনো উপাদানের কি মূল্য-সেই প্রশ্নের একটি দ্ব্যর্থহীন জবাব বাংলাদেশ দিয়েছে।বর্তমানে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যু নিয়ে আন্দোলন চলছে।সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে বিএনপি।কিন্তু বিএনপির চেয়ারপারসন গুরুতর অসুস্থ,তার চিকিৎসা দরকার।খালেদা জিয়া কারাবন্দী হিসেবে গুলশানের ফিরোজায় আছেন।চিকিৎসার জন্য অবিলম্বে তাকে বিদেশে নেয়া দরকার।এ দেশে বিত্ত কিংবা প্রতিপত্তি খাটিয়ে খুনের মামলার দণ্ডিত আসামিরাও মাসের পর মাস হাসপাতালে থেকে চর্ব্যচোষ্য চাখতে পারে। সুতরাং অসুস্থ খালেদা জিয়াকে কেন বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেয়া যাবে না,এ প্রশ্ন উঠতেই পারে।সরকার বলছে,দেশেই চিকিৎসা হবে অর্থাৎ সরকার তাকে হাতের মুঠোর বাইরে যেতে দিতে নারাজ।সরকার হয়তো আশঙ্কা করছে,তিনি বিদেশ গেলে দলের লোকদের সাথে নানা অসিলায় মিটিং করবেন,চিরকুট চালাচালি হবে;তিনি রাজনীতি করবেন।
একজন কারাবন্দীকে সরকার তাঁর পছন্দমতো চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ দেবে কি না সেটাই এখন প্রশ্ন।আমাদের অতীত ইতিহাস কী বলে?
এক-এগারোর তত্ত্বাববধায়ক সরকারের সময় খালেদা জিয়া ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দু’জনই গ্রেফতার হন।দেশে সামরিক আইন জারি না হলেও সামরিক বাহিনীই প্রকৃতপক্ষে দেশ চালাচ্ছিল।ওই সময় দেশের এই দুই জনপ্রিয় নেতাকে সাধারণ কারাগারে ঢোকানো হয়নি।জাতীয় সংসদ চত্বরে দুটি ভবনকে উপকারাগার ঘোষণা করে সেখানে তাদের রাখা হয়েছিল।ওই সময় কারাবিধি কতটুকু মানা হয়েছে,জানি না। তবে আর দশজন সাধারণ বন্দীর মতো আচরণ করা হয়নি তাদের সাথে।
২০০৮ সালের ১৩ এপ্রিল বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনায় তত্ত্বাববধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের বৈঠকের পর শেখ হাসিনা প্যারোলে ছাড়া পান।প্যারোলের মেয়াদ ছিল ৬ আগস্ট ২০০৮ পর্যন্ত।১২ জুন ২০০৮ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন।সেটা যদি সম্ভব হয়ে থাকে তাহলে এই মুহূর্তে সরকার চাইলে খালেদা জিয়াকেও বিদেশে তার পছন্দমতো চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ দিতে পারে।এতে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।
হাটে,মাঠে,ঘাটে কিংবা বাসে,ট্রেনে,লঞ্চে পরিচিত কারো সঙ্গে দেখা হলে কুশল বিনিময়ের পর প্রথম যে প্রশ্নটি শুনতে হয় তা হলো:ভাই, দেশের অবস্থা কী?এ রকম সর্বজনীন ভাবনা বা জিজ্ঞাসা পশ্চিমের দেশগুলোতে নেই।আমাদের এখানে আকছার এমন শুনতে হয়।এর কারণ ঠিক জানি না।তবে আন্দাজ করি,দেশ ভাবনা সবার মধ্যেই কমেবেশি আছে।কারণ,দেশ স্বাধীন করতে গিয়ে আমজনতাকে অনেক ত্যাগস্বীকার করতে হয়েছে।এর বিপরীত চিত্রও আছে।কেউ কেউ নিজের,পরিবারের বা গোষ্ঠীর কথা ছাড়া আর কিছু ভাবেন না।
তো,দেশের অবস্থার প্রসঙ্গ উঠলে আগে অনেক কিছু বলতাম।এখন সব একঘেয়ে লাগে।বলি,ভাই দেশ নিয়ে চিন্তার ফুরসত পাই না।নুন আনতে পান্তা ফুরোয়।বাজারে গেলে জিনিসের দাম শুনে রক্ত মাথায় উঠে যায়।বাজারের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাই।চিনিতে আগুন,পেঁয়াজে আগুন,বঙ্গবাজারে আগুন,সবজিতে আগুন,মুরগিতে আগুন,ওষুধে আগুন-ডিমে আগুন এ আগুন কবে কিভাবে নিভবে কেউ জানে না।দেশ নিয়ে ভাবার সময় কই?তাতেও বন্ধু নিবৃত্ত হন না।এক বন্ধু প্রশ্ন করল,ভাই,খালেদা জিয়া জেলে বিএনপি নেতারা কেন আন্দোলন করতে পারল না?বলি,সেটা বড় নেতারা বলতে পারবে।
আরেক বন্ধুর প্রশ্ন,২০১৮ সালে বিএনপি খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে কেন নির্বাচনে গেল?আমি সংকোচ বোধ করি।বেগম জিয়াকে জেলে রেখে সংলাপে যাওয়াটাই ছিল ভুল সিদ্ধান্ত।
বন্ধু বলেন,মেরুদণ্ডহীন নেতা ড.কামালকে শীর্ষ নেতা মেনে বিএনপি আরো বড় ভুল করেছে।ঢাল নেই তলোয়ার নেই কিছু খুচরা পার্টি নিয়ে নির্বাচনে গিয়েছে।সুতরাং সেই নেতাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেই ভালো উত্তর পাওয়া যাবে।বেগম জিয়া জেলে,বিএনপি একটা হরতাল করল না।ছাত্রনেতারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের ডাক দিলো না।একদিনের জন্য একটা অবরোধ করল না।ড.কামাল তো সরকারের ইশারায় নির্বাচনে এসেছিল।এখন জনগণের মনে প্রশ্ন জাগে,বিএনপি কি ওয়ান ম্যান,ওয়ান পার্টির নেতাদের এবং ন্যাপ অথবা ওয়ার্কার্স পার্টির সাবেক নেতাদের কথায় চলবে নাকি মেরুদণ্ডহীন আরেক ড.কামাল খুঁজবে?
কী করতে বলেন?
এভাবে তো দেশ চলতে পারে না।
ভাই,আমি তো দেশ চালাই না।যারা দেশ চালান,আমাদের কথা ভাবার সময় কোথায় তাদের!
তাই বলে তো এড়িয়ে যাওয়া যায় না।আমাদের একটা নাগরিক দায়িত্ব আছে না?
না,এখন আমি আর এটা মনে করি না।দেশ যারা চালান,তারা এভাবেই চালাতে থাকবেন।আমাদের কিছু করার নেই,চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া।
ভাই,আপনি তো হতাশাবাদী।
হতাশা বলে বাংলায় একটা শব্দ আছে তো!এখন সেটাই প্রযোজ্য।আমি কোনোভাবেই এ দেশকে আমার দেশ ভাবতে পারছি না।
কেন কেন?
কারণ,গত পঞ্চাশ বছরে দেশে একটি মালিক সমিতি তৈরি হয়ে গেছে।দেশ চলে তাদের ইচ্ছায়,তাদের সামনে।তারা নিয়মিত ওয়াজ-নসিহত করে।আমরা সায় দিয়ে যাই।এই তো!তাই বলে তো সব ছেড়ে ছুড়ে চুপচাপ ঘরে বসে থাকা যায় না।
যান,মাঠে যান আন্দোলন করেন,গনেশ উল্টে দেন।পারবেন?
কেন, অমুক ভাই, তমুক ভাই তো আন্দোলনের ডাক দিচ্ছেন।
ভাই,এসবই কথার কথা,ফাঁকা আওয়াজ।তলে তলে এরা সরকারের সাথে লাইন দিচ্ছে।এরশাদ সাহেব কী বলেছিলেন,ভুলে গেছেন?
কী বলেছিলেন?
বলেছিলেন,‘এরা সারা দিন আমাকে গালাগাল করে।রাত হলেই আমার কাছে আসে।’শুনেছি,এরা নিয়মিত টাকা ভর্তি খাম পেত।
তাই বলে তো এসব মেনে নেয়া যায় না।দেশে গণতন্ত্র নেই।একটা ফেয়ার নির্বাচন করতে হবে।
চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষের দিকে নির্বাচন হবে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।কী হবে তখন?আমরা অনেক দৃশ্যকল্পের কথা ভাবি।উন্নয়ন পরিকল্পনায় এর নাম হলো সিনারিও ডেভেলপমেন্ট।তো ভবিষ্যতে কী কী সিনারিও দেখতে পাব?জনমনে যেসব চিন্তা আছে আর হাওয়ায় যা ভেসে বেড়াচ্ছে,তা অনেকটা এ রকম:
এক.নির্বাচন কি হবে?
দুই.নির্বাচন হলে তাতে সব দল কি অংশ নেবে?
তিন.বড় একটি দল অংশ না নিলে কি নির্বাচন জায়েজ হবে?
চার.মুখে যতই হম্বিতম্বি করুক,তলে তলে কি দর-কষাকষি হচ্ছে?
পাঁচ.আগামী সংসদে বিরোধী দলকে কয়টি আসন দেয়া হবে?
ইংরেজিতে ফেইট একমপ্লি বলে একটা কথা আছে।
নিয়তির বিধান।কথা হলো,নির্বাচনের রাজনীতি কি সংবিধান অনুযায়ী চলবে,নাকি নিয়তি দ্বারা,ইতোমধ্যে তা নির্ধারিত হয়ে গেছে?
শেষ কথা বলতে চাই বিএনপিকে নিয়ে।আমরা দেখতে পাচ্ছি ক্ষমতাসীন দল মাঠ ছাড়বে না।সোনার ছেলেরা লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তাঘাট পাহারা দিচ্ছে,যেন কোনোভাবেই শত্রুপক্ষ রাস্তার দখল না নিতে পারে।বিএনপির বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে মনে হয় তারাও এবার মরিয়া।যে ভাষায় তারা সভা-সেমিনারে কথা বলে,তাতে মনে হয় এবার একটা এসপার-ওসপার হবে।
উভয় পক্ষেরই গেম প্ল্যান আছে।ক্ষমতাসীন দলের গেম প্ল্যান কিছুটা বোঝা যায়।২০১৪ আর ২০১৮ সালে তাদের কৌশল কাজ করেছে। তারা বেশ আত্মবিশ্বাসী।দুবারই বিএনপির কৌশল মাঠে মারা গেছে।এবার তাদের তূণে কী ধরনের তীর আছে,তা স্পষ্ট নয়।বিএনপির ডাকে বড় বড় জমায়েত হচ্ছে।বোঝা যায়,বিএনপির জনসমর্থন আছে।কিন্তু জনসমর্থন তো শেষ কথা নয়।মাঠে আপনি যতই ভালো খেলেন,৯০ মিনিটের খেলায় ৮৫ মিনিট বল আপনার দখলে থাকলেও শেষ মিনিটে প্রতিপক্ষের একজন স্ট্রাইকার এসে বল আপনার জালে ঢুকিয়ে দিলো।রেফারির বাঁশি বাজল।খেল খতম।এখানে ভালো খেলার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দলে নেতৃত্ব।বেগম জিয়ার নেতৃত্ব এখন প্রয়োজন।যেভাবে ৮০ এর শতক থেকে ৯০ এর দশকে বেগম জিয়া আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন এখনও যদি দিতে পারেন তা হলেই সফলতায় পৌঁছা যাবে।